
দিন যায়, রাত আসে। সপ্তাহ যায়, মাস আসে। মাস যায়, নতুন বছর শুরু হয়। এভাবেই আমাদের জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। এই যে, দিনরাতের পর সপ্তাহ, সপ্তাহের পর মাস, মাসের পর বছর, এগুলো আল্লাহপাক এর মহাকৌশলে নিয়ন্ত্রীত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ্ বলেন, আদম সন্তানরা আমাকে কষ্ট দেয়। তারা যামানাকে গালি দেয়; অথচ আমিই যামানা। আমার হাতেই সকল ক্ষমতা; রাত ও দিন আমিই পরিবর্তন করি। [৬১৮১,৭৪৯১; মুসলিম ৪০/১, হাঃ ২২৪৬] বাংলাদেশের ৯৩ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এবং এ দেশের সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে আমাদের রাষ্ট্রধর্ম “ইসলাম’’। কথা হচ্ছে ইসলামে কোনপ্রকার কুকালচার বা বিজাতীয় কৃষ্টি কিংবা অপসংস্কৃতি উদযাপনের অনুমোদন আছে কি? ইসলামের কথা না হয় পরে বলি, সচেতন বাঙালিদের বিবেকে প্রশ্ন রাখছি- থার্টি ফাস্ট নাইট কি আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে আছে? যদি না থাকে তবে কেন দেশপ্রেমী শহীদের পবিত্র রক্তে ভেজা সবুজ এই জমিনে থার্টি ফার্স্ট এবং নববর্ষের নামে নষ্টামির নির্লজ্জ প্রদর্শনীর আয়োজন ? আমাদের তো স্বকীয় সন আছে, বাংলা ক্যালেন্ডার আছে, তবে কেন সেই ব্রিটিশদের ইংরেজি সন নিয়ে এতো মাতামাতি ? থার্টিফাষ্টসহ ইসলামবিরোধী কাজ ৯৩ ভাগ মুসলমানের দেশে ডাকঢোল পিটিয়ে হয় কি করে ? মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ হিসেবে থার্টি ফার্স্ট নাইটের ন্যায় বেহায়াপনা ও ইসলামবিরোধী কাজগুলো থেকে নিজে বিরত থাকা ও অন্যকে বিরত রাখার চেস্টা করা একজন মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব।
ইতিহাসের আলোকে বিভিন্ন জাতির সূত্রানুযায়ী ইংরেজি নববর্ষ এবং ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ কালচারের শেকড়ের কথায় আসি। খ্রিস্টপূর্ব ’৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার [খৃস্টান ধর্মযাজক), সর্বপ্রথম ইংরেজি নববর্ষ উৎসবের প্রচলন করেন। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে ইংরেজি সনের বিস্তৃতি। ধীরে ধীরে শুধু ইউরোপে নয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩১শে ডিসেম্বর রাতে থার্টি ফার্স্ট নাইট সাধারণত নাচ, গান, খায়া-দাওয়া, আতশবাজি এবং বিভিন্ন পাটির্র মাধ্যমে পালন করা হয়, যা গ্রোগরিয়ান ক্যালেন্ডারের নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর একটি খ্রিষ্টীয় ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি, এতে অপ্রয়োাজনয় খরচ, অপচয় এবং অনেক সময় অনৈতিক কার্যকলাপ জড়িত থাকে।
প্রাচীন পারস্যের সম্রাট জমশীদ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে নববর্ষ বা নওরোজের প্রবর্তন করেছিলেন। এ ধারাবাহিকতা এখনো পারস্যে আছে, এবং ইরানে নওরোজ (নতুন দিন) ঐতিহ্যগত নববর্ষের জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়। ইরানে নববর্ষ বা নওরোজ শুরু হয় পুরনো বছরের শেষ বুধবার এবং উৎসব চলতে থাকে নতুন বছরের ১৩ তারিখ পর্যন্ত। ইরান হতেই ইহা একটি সাধারণ সংস্কৃতির ধারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে। মেসোপটেমিয়ায় এই নববর্ষ শুরু হতো নতুন চাঁদের সঙ্গে। ব্যাবিলনিয়ায় নববর্ষ শুরু হতো ২০ মার্চ, মহাবিষুবের দিনে। অ্যাসিরিয়ায় শুরু হতো ২১ সেপ্টেম্বর, জলবিষুবের দিনে। মিসর, ফিনিসিয়া ও পারসিকদের নতুন বছর শুরু হতো ২১ সেপ্টেম্বর। গ্রীকদের নববর্ষ শুরু হতো খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত ২১ ডিসেম্বর। রোমান প্রজাতন্ত্রের পঞ্জিকা অনুযায়ী নববর্ষ শুরু হতো ১ মার্চ এবং খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩-এর পরে ১ জানুয়ারিতে। ইয়াহুদিদের নববর্ষ বা রোশ হাসানা শুরু হয় তিসরি মাসের প্রথম দিন, কতিপয় ইয়াহুদিদের মতে সেই মাসের দ্বিতীয় দিন। মোটামুটিভাবে তিসরি মাস হচ্ছে ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর। মধ্যযুগে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে নববর্ষ শুরু হতো ২৫ মার্চ, তারা ধারণা করতো এদিন দেবদূত গ্যাব্রিয়েল যিশুমাতা মেরির কাছে যিশু খ্রিস্টের জন্মবার্তা জ্ঞাপন করে। অ্যাংলো-স্যাকসন ইংল্যান্ডে নববর্ষের দিন ছিল ২৫ ডিসেম্বর। পহেলা জানুয়ারি পাকাপোক্তভাবে নববর্ষের দিন হিসেবে নির্দিষ্ট হয় ১৫৮২। বাদশাহ আকবরের ফরমান অনুযায়ী আমীর ফতেহ উল্লাহ্ শিরাজী উদ্ভাবিত বাংলা ফসলি সাল চালু হয় ১০ মার্চ ১৫৬৩ সালে। ইংরেজ আমলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হলেও রাজস্ব আদায়ে ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে বাংলা সাল তথা ফসলী সন বেশি ব্যবহার করা হতো। বর্ষবরণের সাথে ধর্মীয় অনুভূতির যোগ শুরু থেকেই ছিল না এবং সেটা আল্লাহ প্রদত্ত কোন নবী-রাসূল আনিত জীবনবিধানে অনুমোদিত হয়নি! মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনি। মজুসী বা অগ্নি উপাসকরা এখনো বর্ষবরণকে সরকারি ছত্রছায়ায় ব্যাপক জাঁকজমকভাবে পালন করে থাকে। একে তারা তাদের ধর্মীয় অনুষঙ্গ মনে করে এবং একে নওরোজ বা নতুন দিন বলে অভিহিত করে। ফসলী সনের নববর্ষ হিন্দুদের খাছ ধর্মীয় উৎসবের দিন। এর আগের দিন তাদের চৈত্র সংক্রান্তি, আর পহেলা বৈশাখ হলো ঘট পূজার দিন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জুলাই থেকে শুরু হয় হিজরিসাল গণনা, এবং হিজরিসালের প্রথম মাস মহররম থেকে গণনা শুরু করা হয়, এবং এটি হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।
ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর হাবিব মোহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে তথা ওহীর মাধ্যমে নাজিলকৃত, একমাত্র পরিপূর্ণ, সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত, নিয়ামতপূর্ণ, অপরিবর্তনীয় এবং মনোনীত দ্বীন। মানুষের মুক্তি ও হেদায়াতের জীবন ব্যবস্থা। যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। সে প্রসঙ্গে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে সূরা আল ইমরানের ১৯ নম্বর আয়াতে বলেন-“নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহপাকের কাছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন”। মহান আল্লাহ আল কোরআনে সূরা মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতে আরো ইরশাদ করেন, “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে (ইসলামকে) পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতসমূহ সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং আমি তোমাদের দ্বীন ইসলামের প্রতি সন্তুষ্ট রইলাম।” তাই দ্বীন ইসলাম ব্যতীত অন্য সমস্ত ধর্ম যা ওহীদ্বারা নাজিল করা হয়েছিল যেমন, তাওরাত, যাবূর, ইনজীল ও ১০০ খানা ছহীফা এবং মানব রচিত মতবাদ যা পূর্বে ছিল ও বর্তমানে যা রয়েছে এবং ভবিষ্যতে যা হবে সেগুলোকে তিনি বাতিল ঘোষণা করেছেন।
এবার দেখা যাক ইসলামের নির্দেশনা এং ইতিহাস পর্যালোচনায় বিশ্বখ্যাত ইসলামিক স্কলারের অভিমত। ইমাম আবু হাফস কবীর রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নওরোজ বা নববর্ষ উপলক্ষে যদি কেউ একটা ডিমও দান করে, তাহলে ঐ মুসলমানের ৫০ বছরের আমল বরবাদ হয়ে যাবে। পবিত্র কোরআন শরিফে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই সমস্ত প্রাণীর মাঝে আল্লআহপাকের নিকট কাফিররাই নিকৃষ্ট, যারা ঈমান আনেনি।” (সূরা আনফাল : আয়াত শরীফ ৫৫) আর নববর্ষ পালনের দ্বারা সে কাফিরদেরই অনুসরণ-অনুকরণ করা হয়।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্ক রাখে, সে তাদের দলভুক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (সুনানে আহমদ, সুনানে আবূ দাউদ) ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে যে, নববর্ষ পালনের প্রবর্তক বিধর্মীরা। তাই ইসলাম নববর্ষ পালনকে কখনোই স্বীকৃতি দেয় না।
হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত উমর ইবনুল খত্তাব (রা.). নবী কারীম (সা.) ্এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমরা ইয়াহুদীদের থেকে তাদের কিছু ধর্মীয় কথা শুনে থাকি, যাতে আমরা আশ্চর্যবোধ করি, এর কিছু আমরা লিখে রাখবো কি? রাসূল (সা.) বললেন, তোমরাও কি দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছ? যে রকম ইয়াহুদী-নাসারাগণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে? অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট পরিপূর্ণ, উজ্জ্বল ও পরিষ্কার ধর্ম নিয়ে এসেছি। নবী মুসা (আ.) যদি দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (মুসনাদে আহ্মদ, বাইহাক্বী, মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত ইত্যাদি)
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। সে প্রেক্ষিতে দেশে ইংরেজি ভাষাসহ বিভিন্ন উপজাতীয় ভাষার ঊর্ধ্বে যেমন রাষ্ট্রভাষা বাংলার মর্যাদা ও প্রাধান্য তেমনি সংবিধানের ২ নম্বর ধারায় বর্ণিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা স্বীকারের প্রেক্ষিতে অন্যান্য ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীর উপরে ইসলাম ও মুসলমানের মর্যাদা ও প্রাধান্য স্বীকৃত হওয়া আবশ্যকের দাবিদার। তাই, থার্টি ফার্স্ট নাইটের মতো বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন রোধে এবং মুসলমানদের ঈমান ও আকিদা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন অপসংস্কৃতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট সাদেক আহমেদ কিশেরগঞ্জ,বাংলাদেশ।
প্রতিনিধির নাম 














